নন্দীগ্রামের মাটিতে জমি আন্দোলনের আদি লগ্নে দু’জনে ছিলেন একই যুদ্ধের সৈনিক। এক জন তখন ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র অন্যতম আহ্বায়ক, কংগ্রেসের তরুণ নেতা। অন্য জন অবিভক্ত তৃণমূল কংগ্রেসের তরুণ বিধায়ক হিসেবে জমি আন্দোলনকে সংগঠিত চেহারা দেওয়ার অন্যতম কারিগর। সোনাচূড়ায় প্রথম জনের বাড়িতে যে দিন হামলা-ভাঙুচর হয়, দ্বিতীয় জন ছিলেন প্রতিবাদে মুখর। বাম আমলের সেই আন্দোলনের পর্বে দু’জনের নামেই কেস-কামারি ছিল বিস্তর।
সেই নন্দীগ্রামে আরও একটি উপনির্বাচনের মুখে প্রথম জনের ঠিকানা আপাতত হলদিয়ার উপ-সংশোধনাগার! উপনির্বাচনের মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়ে ১৯ বছর আগের পুরনো মামলায় কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের গ্রেফতারের ঘটনায় লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে কংগ্রেসের রাজ্য ও সর্বভারতীয় নেতৃত্ব প্রতিবাদে মুখর। কালের যাত্রাপথে দ্বিতীয় জন এখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে। নিজেরই ছেড়ে দেওয়া নন্দীগ্রাম আসনে উপনির্বাচনে তাঁরই প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহকারী, নিহত চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে জিতিয়ে আনার দায়িত্ব বলতে গেলে তাঁরই কাঁধে। তবে অতীতের আন্দোলনে তাঁর এক সময়ের সতীর্থের আকস্মিক গ্রেফতারের ঘটনায় শুভেন্দু অধিকারীকেই কাঠগড়ায় তুলছে বিরোধী শিবির।
হলদিয়ার আদালতে পুলিশ তাঁকে পেশ করতে নিয়ে যাওয়ার পথে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন দাবি করেছেন, “শাসক দল ভয় পেয়েছে।” আঙুল উঠছে শাসক দল তথা রাজ্য সরকারের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’র মনোভাবের দিকেও। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর যদিও পাল্টা যুক্তি, “নন্দীগ্রামে বিজেপি এমনিই জিতবে। আমাদের এ সব করার দরকার পড়বে কেন? মিলন ভোটে লড়বেন, যাঁরা তাঁকে সমর্থন করার, করবেন। তবে নির্বাচন বা উপনির্বাচনের সময়ে নির্বাচন কমিশনের যে সব নিয়ম আছে, পুলিশকে তা মানতে হয়। এখানে সরকারের আলাদা করে কিছু করার নেই।”
তথ্য বলছে, খুন, খুনের চেষ্টা, অপহরণ এবং অস্ত্র আইনে অভিযোগ-সহ ১২টি পুরনো মামলা ছিল মিলনের বিরুদ্ধে। বেরিয়েছে চারটি গ্রেফতারি পরোয়ানা। আদতে নন্দীগ্রামের লোক হলেও মিলন সাম্প্রতিক কালে কলকাতায় থাকতেন। সূত্রের খবর, উপনির্বাচনের মনোনয়ন যাচাইয়ের সময়ে প্রতীক-বিভ্রাট ও প্রস্তাবক-প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দুই তৃণমূলের প্রার্থীরই মনোনয়ন বাতিলের দাবি তুলেছিল কংগ্রেস। পাল্টা ঋতব্রতদের প্রার্থী এহতেশামুল হক কংগ্রেস প্রার্থী মিলনের ওকালতনামায় উল্লিখিত ১২টি মামলার ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ তোলেন। এর পরে কমিশনের পর্যবেক্ষকের নির্দেশে বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় হয় পুলিশ। চণ্ডীপুরের হোটেল থেকে মিলনকে গ্রেফতার করে বারবার গাড়ি বদল করে একাধিক জায়গায় ঘুরিয়ে তাঁকে রাতে চণ্ডীপুর থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং শনিবার পেশ করা হয় হলদিয়ায় অতিরিক্ত বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে। ওই গ্রেফতারের সময়ের মধ্যেই কালীঘাট থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের ঘোষণা করে দেওয়ায় পুরো ঘটনা ভিন্ন রাজনৈতিক মাত্রা পেয়ে গিয়েছে।
পুরনো মামলা এবং মনোনয়ন যাচাইয়ে বিতর্কের দিকে ইঙ্গিত করেই শুভেন্দুর মত, “মামলা আমাদের বিরুদ্ধেও ছিল। তার আইনি সুরক্ষা লাগে। এই মামলা (মিলনের) আমাদের সরকার করেনি। এখন অভিযোগও করেছে তৃণমূলের একটা পক্ষ। এর মধ্যে আমাদের কী ভূমিকা আছে?” তাঁদের প্রার্থী যে অভিযোগ করেছিলেন, তা মেনে নিয়েই গণতান্ত্রিক তৃণমূলের (ডিটিসি) নেতা ঋতব্রতের বক্তব্য, “মামলা থাকলে জামিন নিতে হয় বা আইনি প্রক্রিয়ার কথা জানাতে হয়। সেটাই তো নিয়ম।” আর রাজ্যে এসে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার মন্তব্য, “রাহুল গান্ধী ওই প্রার্থীকে খুন করার লাইসেন্স দিয়েছিলেন নাকি? খুনের মামলা তামাদি হয় না, তাই তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। এটা আইনের বিষয়।”
কয়েক মাস আগে নন্দীগ্রামে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু পেয়েছিলেন ১ লক্ষ ২৭ হাজার ৩০১ ভোট। কংগ্রেস প্রার্থী শেখ জ়ারিয়াতুল হোসেন পেয়েছিলেন ৭৯৪ ভোট। কয়েক মাসে কংগ্রেস শক্তিশালী হয়ে গিয়েছে এবং মমতা-তৃণমূলের সমর্থন পেলে খেলা ঘুরে যাবে বলে প্রশাসনিক ভাবে ‘সবক’ শেখাতে হবে, এটা যুক্তিগ্রাহ্য নয় বলে বিজেপি শিবিরের দাবি। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্যের যদিও পাল্টা দাবি, “বিদ্রোহী তৃণমূলকে দিয়ে এই সময়ে অভিযোগটা বিজেপিই করিয়েছে। তবে এতে কোনও লাভ হবে না। কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছেন। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর, দুই কেন্দ্রেই কংগ্রেসের ফল ভাল হবে।” আর সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্বের তরফে পূর্ব মেদিনীপুরের ভারপ্রাপ্ত নেতা সুজন চক্রবর্তীর মন্তব্য, “বিরোধীশূন্য করার মনোভাবে চলছে বিজেপি। কোথাও বামেদের উপরে আক্রমণ হচ্ছে, কোথাও তার শিকার হচ্ছে কংগ্রেস।”