নয়াদিল্লি, ১৯ সেপ্টেম্বর: নির্বাচন কমিশন পরিকল্পিত ভাবে দুরভিসন্ধির মনোভাব থেকে প্রথমে নন্দীগ্রাম, রেজিনগরের উপনির্বাচন ঘোষণা করে দিয়ে তার পরে তৃণমূলের নাম, প্রতীক ‘ফ্রিজ়’ করে দেওয়ার অন্তর্বর্তী নির্দেশ ঘোষণা করেছে বলে অভিযোগ উঠল। যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী, রাজ্যসভার নির্দল সাংসদ কপিল সিব্বল শনিবার অভিযোগ তুলেছেন, দেরি করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে নির্বাচন কমিশন ইচ্ছাকৃত ভাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলকে জবাব দেওয়ার জন্য সময় বাড়িয়েছে। যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণও পিছিয়ে যায়।
চার বছর আগে শিবসেনায় ভাঙনের পরে নির্বাচন কমিশন শিবসেনার নাম ও প্রতীক ‘ফ্রিজ়’ করে দিয়েছিল। উদ্ধব ঠাকরের গোষ্ঠী এবং দল ভেঙে বিজেপির সঙ্গে হাত মেলানো একনাথ শিন্দের গোষ্ঠীর কেউই শিবসেনার নাম ও তির-ধনুক প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না বলে জানিয়েছিল। তার বিরুদ্ধে উদ্ধব দিল্লি হাই কোর্টে মামলা করেছিলেন। দিল্লি হাই কোর্টের এক বিচারপতির বেঞ্চ, তার পরে ডিভিশন বেঞ্চ—উদ্ধবের আর্জি খারিজ করে। হাই কোর্ট নির্বাচন কমিশনের রায়ে হস্তক্ষেপ করতে চায়নি। তার চার মাস পরে নির্বাচন কমিশন শিন্দের গোষ্ঠীকেই আসল শিবসেনা তকমা দিয়ে তির-ধনুক প্রতীক দেয়।
এ বার কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক ‘ফ্রিজ়’ করে দিয়েছে। শুক্রবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছেন। সোমবার এই মামলার উল্লেখ করে দ্রুত শুনানির আর্জি জানানো হতে পারে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে কি না, তা নিয়ে শীর্ষ আদালতের আইনজীবীরা সন্দিহান। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে উপনির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আইন অনুযায়ী নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেলে আদালত হস্তক্ষেপ করে না। সিব্বলের অভিযোগ, কমিশন জেনে বুঝে, ‘প্রতারণার মনোভাব’ থেকে প্রথমে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচন ঘোষণা করে দিয়ে তার পরে তৃণমূলের নাম-প্রতীক নিয়ে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছে। যাতে সেই নির্দেশে আদালত হস্তক্ষেপ করতে
না পারে।
নির্বাচন কমিশন বলেছে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগবে। আইনজীবীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মুম্বইয়ের আন্ধেরি-ইস্ট বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের জন্য ২০২২-এর ১০ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়ে শিবসেনার প্রতীক, নাম ‘ফ্রিজ়’ করেছিল।
এর বিরুদ্ধে উদ্ধবের মামলায় দিল্লি হাই কোর্ট হস্তক্ষেপ না করলেও কমিশনকে দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
নিতে বলেছিল। কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় ২০২৩-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি। আবার শরদ পওয়ারের এনসিপি-তে ভাঙনের পরে নাম-প্রতীক নিয়ে বিবাদে কমিশন একেবারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ২০২৪-এর ফেব্রুয়ারিতে বিজেপির সঙ্গে হাত মেলানো অজিত পওয়ারের হাতে এনসিপি-র স্বত্ব, প্রতীক দিয়েছিল। দুই ক্ষেত্রেই
মামলা সুপ্রিম কোর্টে। যার ফয়সালা এখনও হয়নি।
সিব্বলের অভিযোগ, এ ভাবেই দল ভাঙানোয় উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কে আসল তৃণমূল, এই নিয়ে বিবাদে নির্বাচন কমিশনের কাছে ৩ জুন চিঠি গিয়েছিল। কমিশন তার পরেই সিদ্ধান্ত নিতে পারত। কিন্তু তারা ২ জুলাই দুই পক্ষের কাছে অন্য শিবিরের অভিযোগের জবাব জানতে চায়। ৬ জুলাই পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। কালীঘাট-তৃণমূল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাব দিলেও ঋতব্রতরা ৬ জুলাইয়ের মধ্যে জবাব দেননি। আরও এক সপ্তাহ সময় চান তাঁরা। কমিশন ১০ জুলাই পর্যন্ত সময় দেয়। ঋতব্রত সেই সময়েও জবাব না দিয়ে আরও দু’সপ্তাহ সময় চান। কমিশন ২৫ জুলাই পর্যন্ত সময় দেয়। এর পরে বিধানসভার স্পিকার ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই চিঠি কমিশনে জমা পড়ে।
সিব্বলের অভিযোগ, ‘‘কমিশন জুন, জুলাই, অগস্ট মাসে সিদ্ধান্ত
না নিয়ে বসে ছিল। তার পর ৭ সেপ্টেম্বর উপনির্বাচন ঘোষণা করে দেয় আর ১৭ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী রায়ে তৃণমূলের প্রতীক ফ্রিজ় করে। যাতে নির্বাচনের মধ্যে আদালত এ নিয়ে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। কেন্দ্র ও রাজ্যের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আঁতাঁত চলছে।’’
আজ মমতাপন্থী তৃণমূলের নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন নির্বাচন কমিশনকে ‘একদম চোর’ বলে নিশানা করেছেন। আর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে সিব্বলের প্রশ্ন, কেন তিনি ঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেননি? কেন তিনি খোলাখুলি পক্ষপাত করছেন? কেন তিনি নিজের গদি বাঁচাতে প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করছেন?