নয়াদিল্লি, ১৯ সেপ্টেম্বর: নির্বাচনে জিতলেও বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের সংগঠনগুলির জনপ্রিয়তা যে কমছে, তার প্রমাণ মিলল। উল্টো দিকে কংগ্রেসের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও বিরোধীদের মধ্যে ঐক্যের অভাবের ফলে বিজেপি ও তার সংগঠন যে বারবার নির্বাচনে ফায়দা তুলবে, তা-ও স্পষ্ট হল। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে দেশের রাজনীতির ছবিই ফুটে উঠল।
যন্তর মন্তরে জেন জ়ি-র আন্দোলন, মোদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, দক্ষিণ দিল্লিতে ছাত্রাবাস ভেঙে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের মৃত্যুর পরে বিজেপির নেতৃত্বাধীন দিল্লি সরকার ও পুরসভার দিকে আঙুল—যাবতীয় চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সঙ্ঘ পরিবারের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনে চারটির মধ্যে তিনটি আসন জিতে নিল। এবিভিপি-র এই জয়ের পরে গোটা বিজেপি শিবির দাবি করেছে, এ থেকে প্রমাণ হল দেশের জেন জ়ি তথা তরুণ প্রজন্ম নরেন্দ্র মোদী তথা বিজেপির পাশেই রয়েছে। দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে যন্তর মন্তরের আন্দোলনের পরে প্রশ্ন উঠেছিল, জেন জ়ি কি মোদী সরকারের থেকে মুখ ঘোরাচ্ছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচন তাই বিজেপির কাছে সম্মানের লড়াই হয়ে উঠেছিল। কংগ্রেস বা এনএসইউআই ককরোচদের আন্দোলন থেকে দূরত্ব রাখলেও, বাম ছাত্র সংগঠন এসএফআই, আইসা এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল।
খোদ অমিত শাহ যুক্তি দিয়েছেন, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় নিছক একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। দেশের প্রতিটি কোণ থেকে এখানে পড়ুয়ারা পড়তে আসেন। এখানকার ভোটের ফল গোটা ভারতের তরুণদের মনোভাবের প্রতিফলন। এই জয় দেশ-বিরোধী শক্তির প্রতি বার্তা। ‘রাষ্ট্র প্রথম’-এর মতাদর্শের প্রতি ভরসার প্রমাণ।
বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব এই সাফল্যকে সামনে রেখে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশকে নাকচ করে দিতে চাইলেও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভোটের ফল বলছে, এবিভিপি সভাপতি, সম্পাদক, যুগ্ম-সম্পাদক পদে জিতলেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। সভাপতি আসনে নির্বাচনে গত বারের এবিভিপি-র জয়ের ব্যবধান তিন ভাগের এক ভাগ কমে গিয়েছে। কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এনএসইউআই-কে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের খেসারত দিতে হয়েছে। তিনটি আসনেই কংগ্রেসের সঙ্গে বামেদের এসএফআই-আইসার জোট হলে ফল অন্য রকম হত। সভাপতি পদে এবিভিপি ও এনএসইউআই-এর ব্যবধানের থেকে বামেদের ভোট অনেক বেশি। যুগ্ম-সম্পাদক পদে এনএসইউআই বিশেষ যাদবকে প্রার্থী না করায় তাঁকে সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব সমর্থন করেছিলেন। ওই পদে এবিভিপি যে ব্যবধানে জিতেছে, সমাজবাদী ও বামেরা তার ২০ গুণ বেশি ভোট পেয়েছেন।
এবিভিপি শুধুমাত্র সহ-সভাপতি পদে জিততে পারেনি। ওই পদে জয়ী দীপাংশু শোকিনকে এনএসইউআই প্রার্থী না করায় তিনি নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন। দিল্লির বাস কনডাক্টরের পুত্র দীপাংশু সবথেকে বড় ব্যবধানে জিতেছেন। দীপাংশুর বদলে এনএসইউআই কংগ্রেসের সদর দফতরের ভারপ্রাপ্ত নেতা মণীশ চরথের ছেলে বীর চরথকে ওই পদে প্রার্থী করেছিল। এ নিয়ে এনএসইউআই-এর ভারপ্রাপ্ত নেতা কানহাইয়া কুমারের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে। কংগ্রেস সূত্রের দাবি, দীপাংশুকে সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি রাজি হননি।
এনএসইউআই অভিযোগ তুলেছে, ছাত্র সংসদের নির্বাচনে ভোট গণনায় রিগিং হয়েছে। সভাপতি পদে ভোটগণনার শেষের আগে পর্যন্ত এনএসইউআই এগিয়ে ছিল। তার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এসে ভোটগণনা বন্ধ করে দেন। এক ঘণ্টা ভোটগণনা বন্ধ থাকার পরে এবিভিপি-র জয় ঘোষণা করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে বিক্ষোভ দেখানোয় পুলিশ পড়ুয়াদের আটক করেছে।
ককরোচ জনতা পার্টির যুগ্ম-আহ্বায়ক সৌরভ দাস বলেন, ‘‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোটের ফল দিয়ে ছাত্রদের মনোভাব বোঝার ব্যারোমিটার হতে পারে না। কারণ কিছুদিন আগেই বিজেপি শাসিত উত্তরাখণ্ডের গঢ়বাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোটে এবিভিপি হেরে গিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও এবিভিপি-র বিরুদ্ধে সিংহভাগ পড়ুয়া ভোট দিয়েছেন। কিন্তু সেই ভোট বিভিন্ন শিবিরে ভেঙে গিয়েছে।’’