রুশ তেলেও শাস্তি-শুল্ক নয়, সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের
নিজস্ব সংবাদদাতা
নয়াদিল্লি, ১৭ অক্টোবর: আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান যে কোনও সময়ে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়ার মধ্যে আর কোনও চমক নেই বলেই মনে করেন কূটনীতিকরা। কখনও তা অপ্রত্যাশিত হয়, কখনও বা কার্যকারণ স্পষ্ট থাকে। আজ জাতীয় স্বার্থে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আইনের কয়েকটি বিষয়ের উপর তাঁর স্থগিতাদেশ চাপানোর পিছনে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের জুজু রয়েছে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। এই স্থগিতাদেশের মোদ্দা বিষয়,
রাশিয়ার থেকে তেল-গ্যাস কিনলেও ভারত, চিনের মতো ৫টি দেশের উপর কোনও শুল্ক চাপাবে না আমেরিকা। বিষয়টি নিঃসন্দেহে নয়াদিল্লির কাছে স্বস্তির। কূটনৈতিক শিবিরের আশাবাদী অংশ এক পা এগিয়ে এটাও বলছে, দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি রূপায়ণের প্রশ্নেও এটির ইতিবাচক প্রভাব
পড়তে পারে।
আগামী ৩ নভেম্বর আমেরিকায় মধ্য়বর্তী ভোট। তার আগে দেশবাসীর মন পেতে রাশিয়ার থেকে বিপুল ডিজ়েল কেনার কথা ঘোষণা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। যে ট্রাম্প রাশিয়া থেকে তেল কিনলে কয়েক ঘণ্টা আগেও হুঁশিয়ারি দিতেন, সেই তিনিই দেশের অন্দরে বেকায়দায় পড়ে যাওয়ায় রাশিয়ার থেকে ডিজ়েল কেনার কথা ঘোষণা করেন বলে জানাচ্ছে কূটনৈতিক মহল। এবং তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েন। প্রশ্ন ওঠে, যিনি রাশিয়ার তেল কেনায় অন্য দেশের উপরে শাস্তিমূলক শুল্ক চাপাতে চান, তিনি কি না নিজেই ভ্লাদিমির পুতিনদের থেকে
ডিজ়েল কিনবেন?
এমনিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বেকায়দায় আছেন ট্রাম্প। এই নির্বাচনে ট্রাম্পের কুর্সি যাবে না। কিন্তু কংগ্রেসের নির্বাচনী ফলাফলের উপরে অনেকটাই নির্ভর করবে, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের হাত আগামী দিনে কতটা বাঁধা থাকবে। সেই আবহে গত ১ অক্টোবর একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে ট্রাম্পের উপরে রুষ্ট আমেরিকানদের বড় অংশ। জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্যের জন্য তাঁরা ট্রাম্পকেই দুষেছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যে ভাবে অর্থনীতি সামলাচ্ছেন, যে ভাবে ইরান যুদ্ধ সামলাচ্ছেন ট্রাম্প, তা পছন্দ হয়নি আমেরিকাবাসীর। এমনকি, তাঁর ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং’ তলানিতে ঠেকেছে।
তবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যা-ই হোক না কেন, ট্রাম্পের ‘স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’-এর আওতায় নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও শুল্ক থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত ভারতকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে। তবে স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদী কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত নয় নয়াদিল্লি। তাই এই ছাড় থাকতে থাকতেই যতটা সম্ভব রাশিয়ার তেল আমদানি করে নিতে চায় ভারত। জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে সমুদ্রপথে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের বৃহত্তম ক্রেতা। দৈনিক গড়ে ১৮ লক্ষ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করেছে ভারত। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চিন, তাদের দৈনিক আমদানির পরিমাণ ১২ লক্ষ ব্যারেল। প্রথম পাঁচটি আমদানিকারী দেশের তালিকায় রয়েছে ইতালি, তুরস্ক ও নেদারল্যান্ডসও। সেপ্টেম্বরে ভারত দৈনিক প্রায় ১৮.২ লক্ষ ব্যারেল রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। একই সময়ে চিনের আমদানির পরিমাণ ছিল দৈনিক প্রায় ১৪.৯ লক্ষ ব্যারেল। জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা কেপলারের পূর্বাভাস, অক্টোবরে ভারতের আমদানি দৈনিক ১৯ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছতে পারে।
ওয়াকিবহাল সূত্রের বক্তব্য, ‘এই সিদ্ধান্ত ভারতের পক্ষে মনস্তাত্ত্বিক ভাবে ইতিবাচক। তবে রাশিয়া সম্পর্কে ট্রাম্পের বারবার অবস্থান পরিবর্তন এবং তাঁর বর্তমান মেয়াদে ভারতের প্রতি সাধারণভাবে বৈরি মনোভাবের কথা মাথায় রেখে সতর্ক থাকতে চাই। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এই বিষয়টি নিয়ে আরও কিছু ঘটতে পারে।’
তেলের দাম, সরবরাহের পরিস্থিতি এবং ভূরাজনৈতিক চাপের কারণে রাশিয়া থেকে ভারতের আমদানির পরিমাণে ওঠানামা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প সময়ের মধ্যে রুশ তেলের আমদানি এতটা বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির সামগ্রিক চিত্র বদলে গিয়েছে। পশ্চিম এশিয়া এবং অন্যান্য উৎপাদক দেশের তেলের তুলনায় কম দামের কারণে রুশ তেল ভারতের কাছে আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে। ইরান যুদ্ধের জেরে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় যে পরিমাণ তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, রাশিয়া সেই ঘাটতির একটি অংশ পূরণ করেছে।