বিবিধের মাঝে মিলনের বার্তায় উদ্ভাসিত মণ্ডপ
অগ্নি রায়
নয়াদিল্লি, ১৭ অক্টোবর: ডাকের সাজের সাবেকিয়ানা থেকে পরিবেশ চেতনার বার্তা। সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে অভিনব থিমের প্রদর্শন। দিল্লি পর্যটন মন্ত্রকের পুজোকেন্দ্রিক পদযাত্রা থেকে প্রবাসে বাঙালি সত্তার উদ্যাপন। চিত্তরঞ্জন পার্কের চিরাচরিত বাঙালিয়ানা থেকে সুদূর নয়ডার ক্রমবর্ধমান পুজোর সম্প্রসারণ। পুজোর মাধ্যমেই বই এবং ছাপা অক্ষরের শক্তিকে আবাহন। এ রকমই বহুধায় সম্মিলিত রাজধানীর এ বারের শারদোৎসব।
দেশ গঠনে মুদ্রিত শব্দের ঐতিহ্যকে সামনে রেখে ৩৮তম দুর্গাপুজো উদ্যাপন করছে আরামবাগ পুজো সমিতি। যার ঘোষিত থিম, ‘মুদ্রণের শক্তি কখনও ম্লান হয় না।’ পাহাড়গঞ্জের আরামবাগ পুজো প্রাঙ্গণকে মুদ্রিত শব্দের প্রতি এক দৃশ্যমান শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। সাংবাদিকতা, সাহিত্য, শিক্ষা, জনপরিসরের আলোচনা এবং ঐতিহাসিক নথি সংরক্ষণে মুদ্রণের অবদানকে তুলে ধরা হয়েছে এই পুজোয়। পুজো সমিতির চেয়ারম্যান অভিজিৎ বসু মুদ্রিত যোগাযোগের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা ও সমাজে তার প্রভাবের কথা বললেন। তাঁর কথায়, “মানবসভ্যতার বিকাশে মুদ্রণের অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে। ঐতিহাসিক আন্দোলনের নথি সংরক্ষণ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারকে জনসমক্ষে আলোচনার বিষয় করে তোলা— সব ক্ষেত্রেই এর অবদান অমূল্য। সংবাদপত্র নাগরিকদের তথ্য দিয়েছে, বই স্বাধীন চিন্তাকে উৎসাহিত করেছে এবং প্রকাশিত রচনা বিভিন্ন সম্প্রদায়কে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে সাহায্য করেছে। এ বছরের দুর্গাপুজোর মাধ্যমে আমরা সেই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে সম্মান জানাতে চাই, যাঁরা এই অসাধারণ ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন।’’
নয়ডার লোটাস বুলেভার্ড সাংস্কৃতিক সমিতির (এলবিএসএস) পুজো উদ্যাপন খুবই অভিনব। বৃদ্ধাশ্রমের প্রবীণদের দিয়ে নয়ডার বাঙালিদের এই সংগঠনটির পুজো। পাঁচ দিন ধরে থাকছে নাটক, নৃত্য, সঙ্গীত পরিবেশনা-সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সংগঠনের সদস্যদের তৈরি হস্তশিল্পের প্রদর্শনীও হবে। সংগঠনের সম্পাদক কৌস্তুভ ঘোষ বলেছেন, “আমাদের সংগঠন বরাবরই একসঙ্গে থাকার ভাবনায় বিশ্বাসী। প্রবীণেরা যদি এক মুহূর্তের জন্যও নিজেদের একাকিত্ব ভুলতে পারেন, তা হলেই আমরা পুজোকে সফল বলে মনে করব।” পুজো কমিটির তরফে সংশ্লিষ্ট বৃদ্ধাশ্রমটিকে নানা ভাবে সহযোগিতা করার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। সেক্টর ২৬-এর নয়ডা কালীবাড়ির পুজো এ বার ৪৪ বছরে। ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধনে সন্ধ্যার আরতি আর ধুনুচি নাচ নজর-কাড়া। নয়ডারই ৬১ সেক্টরের বলাকা দুর্গাপুজো কমিটির আয়োজনে
ঘরোয়া পরিবেশ, স্থানীয় মানুষের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব।
দিল্লির প্রাচীন পুজো তালিকায় ঢুকে গিয়েছে করোলবাগ পুজো সমিতি, যার সূচনা হয়েছিল ১৯৪২ সালে। চার দিন দশ ব্যঞ্জনে খাওয়ানো হয় হাজার দুয়েক মানুষকে। এখানকার খিচুড়ি, পোলাও আর পায়েসের স্বাদ মনোহর। সমিতির সাধারণ সম্পাদক দীপক ভৌমিকের কথায়, ‘‘আমরা ঘোর করোনা-কালেও পুজো বন্ধ করিনি। পুজোর সঙ্গেই নানা ভাবে সমাজসেবার কাজ চালিয়ে গিয়েছি। এ বারেও পুজো প্রাঙ্গণে যেমন নাচগানের আয়োজন থাকবে, তেমনই থাকবে রক্তদান শিবির। এ বারে রামমন্দিরের আদলে তৈরি হয়েছে প্যান্ডেল।’’
বিবিধের মাঝে মহান মিলনের বার্তা দিচ্ছে গাজিয়াবাদ বৈশালীর সর্বজনীন শ্রীশ্রীকালীপুজো কমিটির পুজো। একুশে পা দেওয়া এই পুজোর সারবত্তা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার মধ্যেই। প্রবীণ ও শারীরিক সমস্যায় থাকা মানুষের জন্য হুইল চেয়ার, বিশেষ শৌচালয়ের ব্যবস্থা, ভলান্টিয়ার বাহিনী রাখা হয়েছে।
বাংলার তাঁতশিল্পের সৌন্দর্যকে মণ্ডপের ভাষায় প্রকাশ করার প্রয়াস করেছে চিত্তরঞ্জন পার্কের নবপল্লি, পকেট ৪০-র পুজো। এ বারের ভাবনায় জামদানি শাড়ির তাঁত-সুতো-আঁচল ও বুটির নকশা। মণ্ডপের প্রবেশপথ থেকে ছাদ পর্যন্ত বুননের জ্যামিতিক নকশা। প্রতিটি সুতো যেমন মিলিত হয়ে শাড়ি তৈরি করে, তেমনই মানুষের নানা স্মৃতি ও শ্রম মিলেই গড়ে ওঠে একটি সংস্কৃতি— এই ভাবনাই পুজোটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। সিআর পার্কেরই বি ব্লকের পুজোয় রবি ঠাকুরকে কেন্দ্র করে পুজোর ভাবনা। মণ্ডপের পরিকল্পনায় রয়েছে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অনুপ্রেরণা। বাংলার পাটশিল্প ও বাঁশের কারুশিল্পকে নতুন মাত্রা দিয়েছে সিআর পার্কের কে ব্লকের কো-অপারেটিভ গ্রাউন্ড। পাটকে ‘সোনালি আঁশ’ এবং বাঁশকে ‘সবুজ সোনা’ হিসেবে তুলে ধরে মণ্ডপে বুনন, তন্তু ও প্রাকৃতিক উপকরণের নান্দনিক ব্যবহার করা হয়েছে। পরিবেশের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক নিয়ে দর্শকদের সামনে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
দিল্লির করোলবাগ পুজো সমিতির পুজো। নিজস্ব চিত্র