ব্রিটেনের পুজোয় অর্থনীতির স্পন্দন
তমালিকা বসু l লন্ডন
উত্তমকুমার, অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো এবং ডেভিড অ্যাটেনবরোর জন্মশতবর্ষের আবহে ব্রিটেনের দুর্গাপুজোও এগোচ্ছে শতকের দোরগোড়ায়। এ বছর ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ড মিলিয়ে ৯১টি দুর্গাপুজোর খোঁজ মিলেছে। তবে ছোট শহর ও নতুন পুজোগুলিকে ধরলে সংখ্যাটি ১০০ ছুঁতে পারে। অতীতে যা ছিল প্রবাসী বাঙালির সীমিত পরিসরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, আজ তা বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আয়োজন, এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উৎসবের পরিধি বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে খরচ। হল ভাড়া, প্রতিমা, খাবার, নিরাপত্তা, বিমা, আলোকসজ্জা, শিল্পী ও পরিবহণ, সব ক্ষেত্রেই মূল্যবৃদ্ধির চাপ। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় ৪৭তম দুর্গোৎসবের আয়োজকদের মতে, ব্রিটেনে মাঝারি ও বড় পুজোর গড় বাজেট প্রায় ২০ হাজার পাউন্ড (২৫ লক্ষ টাকা)। অন্য দিকে, কেন্টের মেডওয়ে ঐকতানের হিসাবে ছোট পুজোর খরচও শুরু হচ্ছে প্রায় ছ’হাজার পাউন্ড থেকে; গত কয়েক বছরে ব্যয় বেড়েছে ১৫–২০ শতাংশ।
লন্ডনের বড় পুজোগুলির বাজেট আরও বেশি। বেঙ্গল হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের লন্ডন শারদ উৎসবে কোভিড-পরবর্তী সময়ে দর্শনার্থীর সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের আয়োজনের জন্য বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার বর্গফুট জায়গা। ব্রিটিশ বাঙালি সমাজে বহুবছর ধরে পুজোর কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন মৈনাক রায়। তাঁর পর্যবেক্ষণ, লন্ডন ও শহরতলির মাঝারি পুজোয় ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার পাউন্ড (২০ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা) খরচ হয়; বড় পুজোর বাজেট পৌঁছতে পারে ৫০ হাজার পাউন্ডে (৬৩ লক্ষ টাকা)। কলকাতার কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা আনানোর আন্তর্জাতিক পরিবহণ, শুল্ক ও বন্দর-সংক্রান্ত খরচও বাড়তি বোঝা।
সব সংগঠনের অবশ্য একই রকম পরিকাঠামো নেই। বার্মিংহ্যামের মিডল্যান্ডস ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ১৯৬৮ সাল থেকে পুজো করছে। নিজস্ব হল থাকায় ভাড়ার খরচ বাঁচলেও রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তায় ব্যয় বাড়ে। নটিংহ্যাম বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের এ বছরের বাজেট প্রায় ১০ হাজার পাউন্ড (১২ লক্ষ টাকা)। চার দিনে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষকে ভোগ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হয়। স্পনসরশিপের পাশাপাশি সদস্যদের চাঁদা ও স্বেচ্ছাশ্রমই ভরসা। পশ্চিম লন্ডনের প্রয়াস দুর্গাপুজোও খরচ সামলাতে চার দিনের আয়োজন কমিয়ে তিন দিনে এনেছে।
তবে এই বিপুল ব্যয়ের অন্য একটি দিকও রয়েছে। পুজোর বাজেটের বড় অংশই থেকে যায় ব্রিটেনের স্থানীয় অর্থনীতিতে। হল ভাড়া যায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে, ক্যাটারিংয়ের বরাত পায় ব্যবসায়ীরা, কাজ পান ফুল বিক্রেতা, মুদ্রক, বৈদ্যুতিক কর্মী, পরিচ্ছন্নতা সংস্থা ও অন্যান্য পরিষেবা প্রদানকারী। দর্শনার্থীদের যাতায়াতও পরিবহণ ব্যবসায় গতি আনে।
শিকড়ের টানে প্রবাসী বাঙালিরা দুর্গাপুজো করেন, কিন্তু তার সুফল সীমাবদ্ধ থাকে না বাঙালি সমাজে। শতকের দিকে এগিয়ে চলা ব্রিটেনের শারদোৎসব তাই শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উদ্যাপন নয়, স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজের বন্ধন দৃঢ় করারও এক অনন্য পরিসর। কাঁসরের ধ্বনির সঙ্গে তাই স্পন্দিত হয় ব্রিটেনের সাংস্কৃতিক অর্থনীতিও।