আরব সাগরের তীরে প্রবাসীর শারদোৎসব
মুম্বইয়ের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে দুর্গাপুজো শুধু চার দিনের উৎসব নয়, শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক বার্ষিক উপলক্ষ। আরব সাগরের তীরে কর্মব্যস্ততার ফাঁকে এই কয়েকটি দিনেই শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বাংলার গন্ধ, লোকশিল্প, গান আর মিলেমিশে থাকার আনন্দ।
পালাভা সিটি ডোম্বিভলীর ‘প্রবাসী বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন’-এর দ্বাদশ বর্ষের দুর্গাপুজোয় এ বার ফিরবে গ্রামবাংলা। মালদহের গম্ভীরা শিল্পীদের মুখোশ নাচ, গান ও কথোপকথনের পাশাপাশি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের হস্তশিল্পীরা নিয়ে আসবেন টেরাকোটা, কাঁথাস্টিচ-সহ নানা শিল্পসামগ্রী। বসবে সোনাঝুরির হাটের আদলে হস্তশিল্পের বাজার, সঙ্গে থাকবে শারদীয়া বইমেলা। আট দিন ধরে চলবে উৎসব।
এই বছর ৯১তম দুর্গাপুজোর আয়োজন করতে চলেছে ১০৪ বছরের পুরনো ‘শিবাজী পার্ক বেঙ্গল ক্লাব’। উদ্যোক্তাদের আশা, পুজোর দিনগুলিতে মুম্বই ও আশপাশের এলাকা থেকে আট লক্ষেরও বেশি দর্শনার্থীর সমাগম হবে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে তুলে ধরা হবে প্রকৃতির সৃষ্টিশীলতা এবং তার বিপুল শক্তি— যে প্রকৃতি জীবন দেয়, আবার প্রয়োজনে তার রুদ্ররূপও প্রকাশ করে। মণ্ডপের নকশা ও সজ্জায় এই ভাবনার প্রতিফলন ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
১৯৫৪ সালে মুম্বইয়ের বুকে প্রবাসী বাঙালিদের মনে বাংলা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগকে বাঁচিয়ে রাখার যে স্বপ্নের সূচনা, আজ ‘চেম্বুর দুর্গাপূজা অ্যাসোসিয়েশন’ সেই ঐতিহ্যের মশাল হাতে এগিয়ে চলেছে ৭২তম বর্ষে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে পুজো মানে শুধু দেবীর আরাধনা নয়, পরিচিত মুখের সঙ্গে দেখা, পুরনো সম্পর্ক ঝালিয়ে নেওয়া এবং বৃহত্তর এক পরিবারের অংশ হয়ে ওঠা। এ বারের মণ্ডপসজ্জায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে বাংলার লোকশিল্প— বাঁকুড়ার পোড়ামাটির পুতুল, পাটের শিল্পকর্ম এবং বাঁশের কারুকাজ। সমাজসেবাকেও গুরুত্ব দিয়ে আসছে এই আয়োজন।
বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার এই প্রচেষ্টা নতুন নয়। বঙ্গীয় সংস্কৃতি পরিষদ শুরু করেছিলেন ভারতীয় রেলে চাকুরীরত কল্যাণবাসী গুটিকয়েক বাঙালি। এক সময় ‘প্রগতি সংঘ’ নামে যে ক্লাব ও পাঠাগারের সূচনা হয়েছিল, তা-ই ক্রমে সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং দুর্গাপুজোর রূপ নেয়। ছয় দশকেরও বেশি সময়ের এই যাত্রায় কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা এবং মন্দির প্রাঙ্গণে দুর্গাপুজোর আয়োজন স্থানীয় বাঙালি সমাজকে দিয়েছে এক স্থায়ী মিলনকেন্দ্র।
এই ধারারই নবীন সংযোজন ঠাণের হিরানন্দানি এস্টেটে গড়ে ওঠা একটি পুজো। প্রায় ৭৫০ বাঙালি পরিবারের বসবাসের এই এলাকায় অনেক দিন ধরেই ছিল ছোটবেলার পাড়ার পুজোর মতো একটি উৎসবের আকাঙ্ক্ষা। বন্ধুদের আড্ডায় জন্ম নেওয়া সেই ভাবনা ২০২৬ সালে বাস্তব রূপ পেয়েছে। ‘আগমনী কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন’-এর পুজোর প্রথম বছরেই শতাধিক পরিবার এগিয়ে এসেছে আয়োজনকে সফল করতে। আগামী প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে তোলাও তার অন্যতম উদ্দেশ্য।
মুম্বইয়ের দুর্গাপুজোগুলির চরিত্র তাই এক রকম নয়। কিন্তু সব ক’টির ভিতরেই রয়েছে পরিচিত আকাঙ্ক্ষা— দূর শহরে থেকেও নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা। প্রবাসের মাটিতেই এক টুকরো বাংলা।